রহস্যাবৃতা

রহস্যাবৃতা

অপর্ণা চ্যাটার্জী

 লালী আর উমেশ এবারে প্ল্যান করেছে ওরা এবার বেড়াতে যাবে রাজস্থান। উমেশ লালীর বিবাহিত জীবন মাত্র দু’বছর। লালী অসাধারণ সুন্দরী মুখ চোখ যেন পাথর খোদাই করে কেটে বসানো। গায়ের রঙ যেন গোলাপ রাঙা। মোমের ছাচে ঢালা পুতুল। উমেশের খুব গর্ব তার সুন্দরী বউকে নিয়ে।যেন গায়ের রক্তটাও বাইরে থেকে দেখা যায়। লালীর বিয়ের পর এটা হয় হানিমুন। লালী প্রচণ্ড উৎসাহে অফিস আর গোছগাছ নিয়ে ব্যস্ত।উমেশ জানে লালী বেড়াবার নামে মেয়ে। যদিও ওর চলন-বলন শান্ত ধীর। গোলাপ পাপড়ির মতন ঠোঁটের হাসি দেখলে সবাই পাগল হয়ে যায়, উমেশ নিজেও পাগল লালীর প্রেমে। কিন্তু নিজে চাকরি করলেও টাকার জন্য উমেশের পকেট সাফ করতে ওস্তাদ। লালিরা প্রথমে যাবে যোধপুর। তারপর ওখান থেকে একটা গাড়ি নিয়ে জয়সলমীর, উদয়পুর, চিতোর, আজমির , মাউন্ট আবু, জয়পুর হয়ে কলকাতায় ফিরবে। উমেশ নিজেও বেড়াতে ভালোবাসে। তাছাড়া লালীর টাকা উমেশের লাগেনা। তাই লালি ঘোরার জন্য সব ব্যবস্থা কম্পিউটারের দেখে নিজের সুবিধা মতো প্যাকেজে তৈরি করে নেয়। প্রথম তিন দিন যোধপুরের সব কিছু ঘুরে নেয় লালীরা। তারপর রওনা দেয় জয়সালমীরে। শীতের শেষে এসেছে, খুব যে গরম তাও না। বেড়াবার জন্য দারুন আবহাওয়া। প্রথম দিন লালী উমেশ সোনার কেল্লায় যায়। সিনেমাটা বহুবার দেখেছে এবার নিজেদের চোখে দেখা। ভরপুর উত্তেজনা। গাড়ি নিচে রেখে টিলার উপর কেল্লা। সামনেই রাজস্থানী ঘরানার সুর বাজছে। কত পুতুল নানা রঙের। তারপর ভিতরের জৈন মন্দির। অপূর্ব কারুকার্য। কি অপূর্ব শিল্পকলা। শেষে সেই ‘মুকুলের বাড়ি’ । লালী উমেশ হাত ধরাধরি করে ঘুরতে থাকে। সত্যিই সোনার কেল্লা। অপূর্ব অতুলনীয়। 

লালী একটা সুন্দর লাল হলুদ খাটরা চোলী পড়েছে। উমেশের চোখ শুধু লালীকেই দেখছে । লালীর হাসি যেন ঝরনার জল। উমেশরা লজে ফিরে আসে সেদিনের মত। রাতে বিখ্যাত ডাল বাটি চুরমা দিয়ে ঘিয়ে ভাজা রুটি খায় উমেশ আর লালী, সাথে বাবলা কাঁটার আচার । পরদিন উমেশ লালী যাবে শ্যাম স্যান্ড দেখতে । ওখানে ওরা রাতে রাজস্থানী নাচ দেখবে আর তাবুতে থাকবে । ভরা পূর্ণিমা রাত উটের পিঠে চেপে লালী উমেশ চলে যায় মরুভূমির ভিতরে । লালী আজও সেই ঘাঘরা পড়েছে কাটা হলুদ রং এর সাথে লাল চোলি। সবাই লালীকে দেখছে । উমেশ লালীকে বলে মুখটা ঢেকে রাখো প্রিয়ে নয়ত সবাই গিলে খাবে । কলকল জল তরঙ্গের মত হাসি ছড়িয়ে যায় লালীর গলায়। মরুভূমি দেখার পর লালী উমেশ রাজস্থানী নাচ গান শুনতে বসে যায় । মাঝখানে আগুন জ্বেলে মেয়েরা নাচছে রাজস্থানী রাজনা। নাচ গান চলার মধ্যেই লালী ড্রাইভারকে বলে চল রাতে চারপাশটা ঘুরে দেখব। ড্রাইভার বলে, চলুন একটা গ্রাম দেখাতে নিয়ে যায় দুপাশে ধুধু করছে । চারপাশ থেকে পাথর চালান হয় ঘর করার জন্য। পাথরের উপর পাথর চাপিয়ে সব ঘর-বাড়ি স্থাপত্য রাজপ্রাসাদ থেকে সবকিছু দেখার মত। হঠাৎ গাড়িটা ডান দিকে মোড় নেয় খানিক এগিয়ে এসে একটা গেটের সামনে দাড় করায় । উমেশ লালী এর হাত ধরাধরি করে নেমে আসে । ড্রাইভার বলে গ্রামের নাম ‘কুলধারা’ এটা খালি গ্রাম। কয়েকশো বছর এটা খালি। মোহছণ্নের মত উমেশ লালী এগিয়ে যায়। খানিকটা জোর করে একটা মন্দিরের মতো পড়ে। লালী তরতরিয়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠে যায় সাথে উমেশও। ছাদ থেকে গোটা গ্রামটায ছবির মত দেখায় চাঁদের আলোয়। লালী ছাদের উপর হাঁটু মুড়ে বসে পড়ে। পাশে উমেশ। সামনে পড়ে রইল ৮০০ বছর।

রাজা বলবীর সিং রাঠোর ছিলেন খুব প্রভাবশালী রাজা। তিনি সব প্রজাদের খুশি দেখতে পছন্দ করতেন। রানী ইরাবতীও ছিলেন প্রচন্ড মাতৃসুলভ।তাই রাজত্ব চলত মহাসমারোহে। রাজা প্রজাদের খোঁজ নিতেউটে চেপে ঘুরে বেড়াতেন। ঘুরে বেড়াতেন রানী ইরাবতীও। প্রতিটি গ্রামের মহিলাদের সুখ-দুঃখ সমানভাবে রাজা রানি ভাগ করে নিতেন। মন্ত্রীরাও নিজেদের মতো করে সব কাজ করতে পারত।দেওয়ান মহাবীর ছিলেন রাজার সব থেকে কাছের মানুষ। মহাবীর ছাড়া রাজা এক পাও নড়তেন না। সবাই তা জানতো। আর দেওয়ানের ছেলে রাকেশ ছিল রানীর প্রাণ। সবাই জানতো পরবর্তী দেওয়ান হবে রাকেশ। ক্রমে রাকেশ জওয়ান হল। উটের পিটে উঠে ঘুরে বেড়াত এ গ্রাম থেকে সে গ্রাম। রাকেশের শুতাম দেহ আর ভরন্ত যৌবন আর মিষ্টি ব্যবহার সবার মন কাড়ত।এমন একদিন উঠের পিঠে চেপে রাকেশ কুলধারা গ্রামে এল গ্রামের মানুষের খোঁজ নিতে। আর চোখ পড়ল ঘাঘরা পড়া এক অপূর্ব সুন্দরীর দিকে। চমকে উঠল রাকেশ, একে মাথায় পাথর নিয়ে গাড়িতে তুলছে। গলার ভিতরের সবটুকুই যেন বাইরে থেকে বোঝা যাচ্ছে। এত সুন্দরী সে। পূজা কুলধারা গ্রামের গরিব বাবা-মার মেয়ে।

পাপা অসুস্থ মাম্মিও কমজোরি। তাই অসহায় হয়ে যায় পাথর তুলে যা রোজগার করে তা দিয়েই সংসার চালায়। পাড়ার সব নারী পুরুষ তাকে পদ্মিনী বলে ডাকে। পূজার বাবা-মাকে মেয়ের শাদী দিতে বলে। কিন্তু কি করে শাদী করাবে। ঘরে খাওয়ার পয়সাও যে নেই। মেয়ের রোজগারে সংসার চলে। পাপা মাম্মি ভয় পায় পূজা বেটির জীবনে পদ্মিনীর মত দুর্ভোগ নেমে আসবে নাতো। পূজা হেসে উড়িয়ে দিত সব কথা। কিন্তু রাকেশ পাগলের মতো ভালোবেসে ফেলল পূজাকে। প্রায় সপ্তাহে দুদিন আসতো রাকেশ। পূজাকে দেখত প্রাণভরে। পূজার মাম্মি পাপা ভয় পায়, তারা ভাবে যে রাজ্যে রাণী পদ্মানীকে পুড়ে মরতে হয়, সে রাজ্যেই পূজার জন্ম। কি করবে ওরা পূজাকে নিয়ে। পূজা মুখ বুজে কাজ চালিয়ে যায়। রাতে মামীর বুকে মুখ লুকিয়ে কাদে। মাম্মি বলে দেখবি সব ঠিক হয়ে যাবে। ওরা রাজবাড়ী লোক তোকে শাদী করবে কেন? রাকেশ পূজার গলার আওয়াজ শোনার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে। রাকেশ রাজকুমার রাজেশকে সব বলে। রাজেশ চমকে উঠে বলে এ কথা একদম ভেবোনা বন্ধু পাপা জানতে পারলে জান নিয়ে নেবে। কিন্তু রাকেশ এক অজানা টানে ছুটে যায় রোজ। পূজা আজ বন্ধ রেখেছে কয়েক দিন। রাকেশ খুঁজে চলে পূজাকে। দেওয়ান ইতিমধ্যে রাজপুত্রের বিয়ের ব্যবস্থা করতে বলেছেন রাজা মহাবীর সিং রাঠোরকে। তারপর দেওয়ান রাকেশের শাদি করাবেন। চারিদিকে পাত্রীর খোঁজ চলছে। কত রাজা মহারাজা তাদের মেয়ের জন্য পত্র পাঠাচ্ছেন। রাজা চান রাকেশের শাদী এক সাথেই হোক। রাকেশ বুঝতে পারে না কি করবে। রানী ইরাবতীর মহলে গিয়ে রাজেশ মাম্মি কে সব খুলে বলে।

প্রতীকী ছবি:  রানি পদমিনি

রানী সব শুনে চমকে ওঠে। সেদিন পূজার পাপার তবিয়াত ঠিক নেই। পূজা কবিরাজের কাছ থেকে ওষুধ নিয়ে ফিরছে।রাকেশ হাজির সামনে। পূজা ভয়ে থরথর করে কাঁপছে ভীরু প্রজাপতির মতো। রাকেশ পূজার হাত চেপে ধরে। বলে একবার কথা বল পূজা তোমার গলার মিঠে আওয়াজ শুনবো। পূজা হাত ছাড়িয়ে পাখির মতো ছুটে পালায় শরমে। রাকেশ বিহ্বল। মাম্মি দাদীর কাছে পদ্মিনীর গল্প শুনেছে। আর পূজাকে সে চোখে দেখছে অবিকাল এক রকম। রানী ইরাবতী রাজাকে রাকেশের মনের কথা বুঝিয়ে বলে। রাজা সব শুনে যায় কোন মতামত দেয় না। সবাই ভাবলো রাজার এই বিয়েতে অমত হবে না। কিন্তু চার দিন পর এক রাতের মধ্যে গোটা গ্রাম খালি হয়ে গেল। কেউ কিছু জানতেও পারলো না। রাকেশ সব জানার পর, কোথায় গেছে তার খোঁজ কেউ কখনো পায়নি। চাঁদের আলোয় ঝলমল করছে চারিদিক লালী উমেশকে জড়িয়ে ধরে ডুকরে কেঁদে ওঠে বলে “ম্যায় কভি তুমকো ছোড়োঙ্গা নেহি”।
উমেশ অবাক হয়ে যায়। তারপর লালী উমেশের হাত ধরে যে বাড়িটায় পূজা থাকত সেখানে গিয়ে বলে “মাম্মি পাপা ম্যায় আ গেয়ি দেখ না”। ড্রাইভার হতভম্ব হয়ে যায় লালীর আচরণ দেখে। তারপর লালী উমেশকে গাড়িতে তুলে সোজা লজে রওনা দেয়। লজে উমেশদের ছেড়ে ডড্রাইভার গ্রামে গিয়ে সবাইকে ঘটনার কথা বলে। পূজা বা পদ্মিনী আবার নতুন জন্ম নিয়ে ফিরে এসেছে। ‘জহরব্রত’ সার্থক হয়েছে রানী পদ্মিনীর। বারবার ফিরে আসছে এই রাজ্যেই। এই খবরটা মুখে মুখে রটে যায়। ভোরবেলা সবাই দলবেঁধে লজে লালীকে দেখতে আসে। শুনতে পায় ভোররাতে লালী উমেশ লজ ছেড়ে চলে গেছে। গ্রামবাসীর মুখে একটাই কথা পদ্মিনী এখনো ফিরে আসে বারবার। কখনো পূজা হয়ে কখনো লালী হয়ে। তবে কি উমেশ রাকেশ ছিল। আটশো বছর পর আবার সামনে এসে দাঁড়ায় কুলধারা গ্রামের কাহিনী।

প্রতীকী ছবি: কুলধারা গ্রাম